Free delivery on all orders over ৳2,000!Shop Now

Modhupok Logo
BooksAuthorsServicesBlogAbout UsContact
Login
Modhupok Logo

Editing, translation & publishing, bringing your words to their flawless final composition.

Policies

  • Privacy Policy
  • Return Policy

Contact

Bulbul Nikunja, 34/4 Ahmedbag,
Dhaka 1214, Bangladesh

+8801972334483

buzz@modhupok.com

Get Weekly Picks

New books, author news & exclusive offers.

© 2026 Modhupok. All rights reserved.

HomeBlogবই সম্পাদনা কেন দরকার
Publishing Insights

বই সম্পাদনা কেন দরকার

মশমোরশেদ শফিউল হাসান
6/19/2026
WhatsAppFacebookXLinkedIn
বই সম্পাদনা কেন দরকার

যত বড় বা নামী লেখকই হন, রিভিউয়ারের মতামত না নিয়ে এবং সম্পাদকের টেবিল না হয়ে পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে একটি বই সাধারণত প্রকাশনার পর্যায়ে যায় না। আর বিষয়গত ও ভাষাগত দুই স্তরে রিভিউ ও সম্পাদনার এই কাজটি হয়। সব প্রকাশকের যে নিজস্ব রিভিউয়ার এমনকি ইন-হাউস সম্পাদক থাকেন তা হয়তো নয়। যাকে বলে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে তাঁরা কাজটি করিয়ে থাকেন। বিশেষজ্ঞ পরীক্ষক পাণ্ডুলিপিটির বিষয়গত মান পরীক্ষা করে তা প্রকাশযোগ্য কি না, এবং প্রকাশের জন্য তাতে কী ধরনের সংশোধন, পরিবর্তন, কতটা কী বর্জন বা সংযোজন দরকার, সে বিষয়ে মতামত দেন। রিভিউয়ারের সেই অভিমত বা পরামর্শ বিবেচনায় নিয়ে লেখক পাণ্ডুলিপিটি পরিমার্জন করলে, এরপর তা সম্পাদকের কাছে যায়। সম্পাদক প্রধানত পাণ্ডুলিপির ভাষার দিকটি দেখেন। তবে ভাষাজ্ঞানের পাশাপাশি, বিষয় সম্পর্কেও তাঁর খানিকটা ধারণা থাকতে হয়। রিভিউয়ারের মতামত বিবেচনায় নিয়েই তিনি সম্পাদনার কাজটি করেন। সেই সঙ্গে বিষয়টিকে পাঠকের বোধগম্য করে তোলা এবং ভাষার শক্তি ও সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য যা করণীয় তা তাঁকে করতে হয়।

উপরে যে-কথাগুলো লিখলাম তা আদর্শ পরিবেশ বা ব্যবস্থার কথা। আমাদের বাস্তবতার সঙ্গে এর মিল সামান্যই। কিংবা একেবারে নেই বললেও চলে। এদেশে বইমেলার সময় এবং তার আগে-পরে, সারা বছর জুড়ে, যে কয়েক হাজার বই প্রকাশিত হয়, তার কতভাগ সম্পাদিত হয়ে বের হয়? প্রকাশনা সংক্রান্ত গোলটেবিলে বসে কিংবা টিভি টক-শোতে এসে যে-প্রকাশকরা পাণ্ডুলিপি সম্পাদনার অপরিহার্যতার কথা বলেন, তাঁরাও কজন আসলে তাঁদের নিজ প্রতিষ্ঠানের প্রকাশনার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব উপলব্ধি করেন? পাণ্ডুলিপি নির্বাচনের বেলায় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী ছাড়া আর কারও কোনো ভূমিকা থাকে কি? নির্বাচনের ক্ষেত্রে পাণ্ডুলিপি, না কি লেখকই আসলে প্রাধান্য পান? এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের সবারই প্রায় জানা।

প্রকাশনা-পূর্ব সম্পাদনার যেটুকু কাজ বর্তমানে সাধারণত এদেশে হয় তা করেন মূলত প্রুফ-রিডাররা। আর তা বানান ও বড়জোর বাক্যশুদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ থাকে। দু-চারটি প্রতিষ্ঠান বাদে আমাদের প্রকাশকদের নিজস্ব কোনো প্রুফ-রিডার নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের প্রুফ-রিডারদের দিয়ে ফর্মা হিসেবে মজুরি ভিত্তিতে তাঁরা কাজটা করিয়ে থাকেন। আর পত্রিকার প্রুফ-রিডাররা তাঁদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের পর কিছু বাড়তি রোজগারের জন্য বইপড়ার প্রুফ-রিডিংয়ের কাজ করেন। প্রকাশকরাও তাঁদের দিক থেকে এটাকে লাভজনক বা সাশ্রয়ী বলে মনে করেন। বস্তুতপক্ষে দু-একশো শব্দের পুঁজি এবং পত্রিকার নিজস্ব ভাষা ও বানানরীতি (যদি থাকে) সম্পর্কে ধারণা নিয়েই দৈনিক পত্রিকার প্রুফ-রিডিংয়ের কাজটা চালিয়ে নেওয়া যায়। কারণ সেখানে দিনের পর দিন ঘুরেফিরে প্রায় একইরকম কতগুলো শব্দ ও বাক্য ব্যবহৃত হয়। কিন্তু সৃজনশীল ও মননধর্মী প্রকাশনার ব্যাপারটা ভিন্ন। পাঠ্যপুস্তক বা নোট-গাইডের সঙ্গেও এর তুলনা চলে না। কয়েক হাজার শব্দ, শব্দ ও বাক্যের নানারকম ব্যবহার, স্থান বা ব্যবহার ভেদে একই শব্দের নানান ব্যঞ্জনা, লেখকের নিজস্ব ভাষাশৈলী বা স্টাইল, বৈচিত্র্য ইত্যাদি সম্পর্কে ধারণাও এক্ষেত্রে জরুরি। কেবল ভাষাগত সম্পাদনার কথাও যদি বলি, যিনি প্রুফ দেখবেন তাঁর পাঠপ্রবণতা, সাহিত্যবোধ, অভিধান (একাধিক) ব্যবহারের আগ্রহ ও পারঙ্গমতা, সাধারণ জ্ঞান (জেনারেল নলেজ অর্থে) এবং সেই সঙ্গে যথেষ্টরকম কাণ্ডজ্ঞানেরও কোনো বিকল্প নেই।

এটা ঠিক যে বর্তমানে বইপড়ায় প্রুফ-রিডিংয়ের জন্য যে-হারে পারিশ্রমিক দেওয়া হয়, তাতে কোনো উচ্চশিক্ষিত (ডিগ্রির অর্থে নয়, বিদ্যা ও সচেতনতার অর্থে) লোক পারতপক্ষে এটাকে পূর্ণকালীন পেশা হিসেবে নিতে আগ্রহী হবেন না। বর্তমান বাজারে কারো পক্ষে তা করে জীবন ধারণ বা সংসার প্রতিপালন মোটেও সম্ভব নয়। প্রকাশকরা যে এই সত্যটা জানেন না তা নয়। তাঁদের তরফও অবশ্য এই কম পারিশ্রমিকের পক্ষে কিছু ‘অকাট্য’ যুক্তি আছে। যদিও কাগজের দাম, ছাপা, বাঁধাই ইত্যাদি অন্য সব খরচের ব্যাপারে তাঁরা সেই যুক্তি প্রয়োগ করতে পারেন না। পত্রিকার পার্টটাইম প্রুফ-রিডারদের না পেলে তাঁরা কী করতেন? প্রকাশনা গুটিয়ে ফেলতেন? এমনিতে প্রুফ দেখা খুবই ক্লান্তিকর ও একঘেয়ে একটি কাজ। শ্রমসাধ্য তো বটেই। সবচেয়ে বড় কথা, দীর্ঘক্ষণ একটানা এই কাজ করা যায় না। করলে সেক্ষেত্রে মনোযোগ ব্যাহত হয়, কাজের প্রতি সুবিচার করা যায় না, কমবেশি ত্রুটি ঘটে। দিনের একটা বড় অংশ পত্রিকায় প্রুফ দেখার দায়িত্ব পালন করার পর বাড়তি উপার্জনের জন্য আবার বাকি সময় বা বাসায় ফিরে একই কাজ করা! ক্লান্ত শরীরে একজন মানুষ কতটা মনোযোগ দিতে পারেন, সহজেই অনুমেয়। অনেকে নিজের নামে প্রুফ নিয়ে পরিবারের অন্য সদস্য বা বাইরের কাউকে দিয়েও দেখিয়ে থাকেন বলে শুনেছি।

এমনিতে প্রকাশনা পর্যায়ে যে-কোনো বইয়ের সম্পাদনা কাজের আংশিক দায়িত্ব প্রুফ-রিডারদের পালন করতে হয়। আমাদের দেশে যেখানে বেশিরভাগ লেখক ও প্রকাশক অদ্যাবধি পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা বা কপি এডিটিংয়ের গুরুত্ব বা প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সচেতন নন কিংবা এ ব্যাপারে অনাগ্রহী, সেখানে প্রুফ-রিডারদের দায়িত্ব বলাই বাহুল্য খুব বেশি। কিন্তু বাস্তবতা হলো, বর্তমানে পত্রপত্রিকায় কর্মরত আমাদের বেশিরভাগ রিডারের এই দায়িত্ব পালনের মতো যোগ্যতা বা সক্ষমতা নেই। এ-ব্যাপারে দু-তিন যুগ আগের অবস্থার সঙ্গে আজকের বাস্তবতার তুলনা করা যাবে না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা বিশেষ করে ভাষা শিক্ষার দৈন্যদশা ও ক্রমাবনতি এর জন্য প্রথমত ও প্রধানত দায়ী, স্বীকার করতেই হবে। শিক্ষাজীবনের গোড়াতেই ভাষা শিক্ষার ভিতটাকে তা নড়বড়ে করে দিচ্ছে। পরবর্তী পর্যায়ে প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার যথেচ্ছাচারিতা ভাষার ক্ষেত্রে এই নৈরাজ্য বৃদ্ধির সহায়ক হচ্ছে। অধিকারী-অনধিকারী বোধ ছাড়া কিছু প্রচার মাধ্যমের নিজস্ব বানান বা ভাষা রীতি উদ্ভাবন ও প্রচলনও এক্ষেত্রে সংকটকে বহুগুণে বাড়িয়ে তুলেছে।

আমাদের দেশে যথার্থ অর্থে সমালোচনা সাহিত্য আজও গড়ে ওঠেনি। যাও বা ছিটেফোঁটা এককালে ছিল, তা-ও আর আজ অবশিষ্ট নেই। পত্রপত্রিকায় বইয়ের আলোচনা মানেই এখন স্রেফ বন্ধুত্বতা, তোষামুদি বা পারস্পরিক পিঠ চুলকানি। সেই সঙ্গে সচেতন ও দায়িত্বশীল পাঠকগোষ্ঠীর অনুপস্থিতিতে বইয়ের কি তথ্য কি ভাষা বা বানান কোনোরকম ভুল বা অসঙ্গতি নিয়েই প্রকাশক বা লেখককে কখনো জবাবদিহিতার মুখোমুখি হতে হয় না। গত কয়েক বছরে আমি বেশ কয়েকজন প্রকাশকের কাছে এ-বিষয়ে জানতে চেয়েছি। তাঁদের প্রত্যেকেই বলেছেন, একমাত্র দামের ব্যাপারটি (‘বইয়ের দাম খুব বেশি’) ছাড়া আর কোনো বিষয়েই কোনো পাঠক চিঠি লিখে বা মেইলে, সাক্ষাতে কিংবা ফোনে তাঁদের সমালোচনা বা আপত্তির কথা বলেছেন, কোনো ভুলত্রুটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন, এরকম অভিজ্ঞতা তাঁদের একেবারেই নেই। ভাবা যায়?

ধরা যাক, কোনো প্রকাশক লেখকের কাছ থেকে ‘কম্পোজড ম্যাটার’ পেয়ে, একবার কি দুবার কোনোরকমে প্রুফ দেখিয়ে, বই বের করে দিলেন। পক্ষান্তরে আরেকজন প্রকাশক ওই একই আয়তনের আরেকটি পাণ্ডুলিপি পেয়ে যথানিয়মে উপযুক্ত ব্যক্তিকে দিয়ে তা রিভিউ, সম্পাদনা ও শেষে তিন থেকে চারবার ভালো করে প্রুফ দেখবার পর আরেকটি বই বের করলেন। ফর্মা গুণে দুটি বইয়ের কি একই বা কাছাকাছি দাম হবে? রিভিউয়ার ও সম্পাদকের সম্মানী (তাঁদের মর্যাদা অনুযায়ী), দুবারের জায়গায় চারবার প্রুফ দেখানো বাবদ বাড়তি খরচ এগুলো কি বইয়ের বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে যুক্ত হবে না? কেবল ফর্মা হিসাব করে সব বইয়ের একরকম দাম, এ নিয়ম কি যুক্তিগ্রাহ্য, আছে কোনো দেশে?

আমাদের লেখকদের অনেকে ইদানীং এতটাই আর্থিক সামর্থ্য এবং প্রভাব-প্রতিপত্তি, ক্ষমতা বা যোগসূত্রের অধিকারী হয়েছেন যে, তাঁদের বই প্রকাশ এবং তার বিজ্ঞাপন বা অন্যান্যভাবে নাম প্রচারের ব্যাপারে প্রকাশকদের খরচ নিয়ে বিশেষ ভাবতে হয় না। লেখক নিজে কিংবা তাঁর তরফে আর কেউ (ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান) সে ভার বহন করে। টাকার হিসাবে যদি পুরোপুরি নাও হয়, অন্যভাবে প্রকাশকদের তাতে পুষিয়ে যায়। এরই পাশাপাশি সমাজের কিছু মানুষের হাতে নানাভাবে প্রচুর টাকা এসে যাওয়ায়, অন্য নানা শখ-সৌখিনতার সঙ্গে তাঁদের অনেকের মধ্যে লেখক হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক, আমলা, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, আইনজীবী, পুলিশ, সাংবাদিক, চিকিৎসক, ছাত্রনেতা সবাই এই গোত্রের মধ্যে আছেন। তাঁদের কারো কারো হয়তো এক সময় লেখালেখির শখ ছিল, চর্চা অব্যাহত রাখতে পারেননি। জীবনে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার পর এখন লেখালেখির জগতে ফিরে আসতে পেরে দ্রুত পরিচিতি ও প্রতিষ্ঠা পেতে চান। অনেকে আবার যেমন অতীতে কখনো লেখালেখির বিষয়টা নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবেননি, এখনও ভাবেন না। তবে বইয়ের মোড়ক উন্মোচন ও সেই সুবাদে প্রচার-পরিচিতি পাওয়া, মেলায় এসে অটোগ্রাফ দেওয়া, খ্যাতনামা ব্যক্তিদের সঙ্গে পান-ভোজন, দেশে-বিদেশে নানা সভা-সেমিনার-সংবর্ধনায় যোগদানের সুযোগ—এই বিষয়গুলো তাঁদের কাছে বেশ উপভোগ্য মনে হয়। আনন্দদায়ক এই অভিজ্ঞতাটা লাভের জন্য কয়েক লাখ টাকা ব্যয় করা তাঁদের জন্য কোনো ব্যাপারই নয় (তাও টাকাটা সব সময় তাঁদের নিজেদের পকেট থেকেও দিতে হয় না)। এভাবে লেখালেখির ব্যাপারে কোনোরকম পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই, কোনোমতে নিজে লিখে বা কাউকে দিয়ে লিখিয়ে অনেকে তাঁরা ইদানীং গ্রন্থকার হয়ে যাচ্ছেন। পাঠক তাঁর বই কেন পড়বে, তাঁর রচনার স্থায়িত্ব কতটা হবে, এসব বিষয় নিয়ে না তাঁর নিজের না প্রকাশকের ভাবনা আছে। বইয়ের ভাষাগত শুদ্ধাশুদ্ধি বা নির্ভুল ছাপা নিয়েও কারো কোনো মাথাব্যথা আছে, বই উল্টে তেমন ধারণা পাওয়া যায় না। প্রচ্ছদটা আকর্ষণীয় বা চকচকে হলেই হলো! সেই সঙ্গে কাগজটা যদি একটু দামি আর বাঁধাইটা মজবুত হয়, লেখক মহাখুশি। অবশ্য আমাদের নামী-অনামী বেশিরভাগ লেখকই বই বের হওয়ার পর নিজের বইটা আর পড়ে দেখেন না। পড়লে, তাতে প্রতি মেলায় এভাবে বই প্রকাশের সংখ্যা ও তার জন্য লেখকদের দিক থেকে প্রকাশকদের ওপর চাপ নিশ্চিত কমতো।

সব দেশে ও সব কালেই লেখকের টাকায় (নিজের কিংবা বন্ধুবান্ধব ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে সংগৃহীত) বই প্রকাশের রীতি চালু আছে। বিশেষ করে নবীন লেখকদের বই কিংবা অবাণিজ্যিক প্রকাশনার বেলায় এটি হয়ে থাকে (বই প্রকাশের সময় সেভাবেই লেখকের সঙ্গে প্রকাশকের একরকম লিখিত চুক্তি হয়)। আর তা কোনো দোষের ব্যাপারও নয়। তবে কোনো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান যখন এ-ধরনের বই প্রকাশ করে, তখন প্রাথমিকভাবে পাণ্ডুলিপির মান বিচার, উপযুক্ত হাতে সম্পাদনা (বিষয় ও ভাষাগত), সতর্ক প্রুফ-রিডিং, নির্ভুল ও ত্রুটিমুক্ত ছাপা, এই প্রতিটি পর্যায় অতিক্রম করেই কাজটা করা উচিত। যেহেতু এর সঙ্গে কেবল লেখকের নয়, প্রকাশকেরও মান-সম্মানের প্রশ্ন জড়িত। কিন্তু আমাদের দেশে বিশেষ করে বইমেলার সময়টাতে ‘ফেল তক্তা মারো পেরেক’ নিয়মে কাজটা করা হচ্ছে। প্রকাশকের কাজটা অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে দাঁড়িয়েছে স্রেফ মুদ্রণ-ব্যবস্থাপকের। প্রকাশকদের বেশিরভাগেরই নিজস্ব ছাপাখানা নেই, থাকলে তাঁদেরকে নির্দ্বিধায় ‘মুদ্রক’ই বলা যেত। বইমেলাকেও প্রকাশকদের মেলা না বলে সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিচারে মুদ্রকদের মেলা বলা যেত।

এদেশের যাঁরা পুরোনো বা ঐতিহ্যবাহী প্রকাশক, যাঁরা বা যাঁদের পূর্বপুরুষরা একদা আগ্রহ বা শখের বশে প্রকাশনা ব্যবসায় এসেছিলেন, তাঁদের অনেকে ইতিমধ্যে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছেন। কেউ কেউ হয়তো সীমিত সংখ্যক বই নিয়ে কোনোমতে প্রতিষ্ঠানটির নাম ভাসিয়ে রেখেছেন, বইমেলা এলে একটা স্টল নিয়ে বসেন। উল্টোদিকে নতুন অনেকে তাঁদের চালু অন্য ব্যবসা থেকে প্রচুর টাকা এনে প্রকাশনা ব্যবসায় ঢালছেন। আবার অন্যান্য ব্যবসার মতো এখান থেকেও টাকা অন্যত্র (এমনকি বিদেশে) সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে শোনা যায়। বইয়ের প্রতি ভালোবাসা বা কোনো রকম সামাজিক দায়বোধ থেকে কতটা আর কতটাই বা অন্যবিধ উদ্দেশ্য থেকে (যেমন জাতে ওঠা, ‘এলিট’ শ্রেণিতে প্রবেশাধিকার পাওয়া, সরকার ও অন্যান্য প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে সংযোগ তৈরি) তাঁরা প্রকাশনা ব্যবসায় এসেছেন, নিজেদের সক্রিয় রেখেছেন, তা নিয়ে প্রকাশক মহলেই মুখরোচক আলোচনা রয়েছে। কাজেই বইমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রকাশক, প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ও বই বিক্রির হিসেব, এর কোনোটি বা সবকটি থেকে বলা যাবে না যে আমাদের সৃজনশীল প্রকাশনা সুসময়ের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে কিংবা তার ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল। কেবল এবারের বা গত দু-এক বছরের একুশে বইমেলার অভিজ্ঞতা থেকে এই হতাশা প্রকাশ নয়। আর রাজনীতিই এর একমাত্র কারণ নয়। বেশ আগে থেকেই এই অধোগতি শুরু হয়েছে।

মৌলিক কোনো চিন্তা, পর্যবেক্ষণ বা গবেষণা ছাড়াই কেবল নেট থেকে ডাউনলোড করে আর গুগল ট্রান্সলেটার কিংবা ইদানীংকালে এআই-চ্যাট জিপিটির সহায়তা নিয়ে একের পর এক বই লেখা এবং এভাবে লেখক, গবেষক বা পণ্ডিত হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার প্রবণতা কি পৃথিবীর অন্যান্য দেশেও বাড়ছে? জানতে ইচ্ছা করে। এতদিন জানতাম অনুবাদ করার জন্য অন্তত দুটি ভাষার ওপর ভালোরকম দখল থাকতে হয়। একইভাবে বিজ্ঞানের বইয়ের (মৌলিক কিংবা অনুবাদ) বেলায়ও অন্তত নির্দিষ্ট ডিসিপ্লিনের লেখাপড়া ও পরিভাষার সঙ্গে পরিচয় থাকা জরুরি। দেশে ইদানীং এত যে অনুবাদগ্রন্থ ও বিজ্ঞানের বই বেরুচ্ছে, কতজন গ্রন্থকারের সে দক্ষতা ও জানাশোনার পটভূমি আছে? কারা কেনেন, কারা পড়েন এসব বই? পড়ার সময় কি তাঁরা মনে মনে সম্ভাব্য ইংরেজিটা কল্পনা করে নেন? এসব নানা প্রশ্ন মনে জাগে।

আমাদের ছাত্রজীবনে অন্তত স্কুল পর্যায়ে পরীক্ষার প্রশ্নে লেখা থাকতো: ‘নিজের ভাষায় লেখো’। সহপাঠীদের অনেকের মতো মুখস্থ বিদ্যায় দক্ষ ছিলাম না, নিজের ভাষায় লিখেই সব সময় পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেয়েছি। শিক্ষক হিসেবেও উদ্ধৃতি বা মুখস্থ বিদ্যার বদলে যাঁদের উত্তরপত্রে মৌলিকত্ব এবং শুদ্ধ সরল বাক্যের আধিক্য দেখেছি, তাদের বেশি নম্বর দিয়েছি। এখন কি প্রশ্নপত্রে আর আগের মতো ‘নিজের ভাষায় লেখো’ কথাটা লেখা থাকে না? গত কয়েক বছর ধরে অনেক লেখকেরই পাণ্ডুলিপি পরীক্ষা ও সম্পাদনা করতে গিয়ে বারবার আমার মনে এ প্রশ্নটা জেগেছে।

সূত্র: রাখাল রাহা সম্পাদিত, সৃজন উৎকর্ষ ও মননে শৃঙ্খলা: সম্পাদনার ২৫ বছর (ঢাকা: সম্পাদনা, ২০২৬), পৃ. ১৩-১৯।

WhatsAppFacebookXLinkedIn

More from the Journal

নূতন কথা গড়া
Publishing Insights

নূতন কথা গড়া

Jun 19, 2026

বই কেনা
Publishing Insights

বই কেনা

Jun 19, 2026

রুপালি স্নান

রুপালি স্নান

Jun 19, 2026

Comments

Sign in to join the conversation.

Sign in to comment